এআই স্মার্ট গ্লাস কি আপনার অজান্তেই ব্যক্তিগত কথোপকথন রেকর্ড করছে?
এআই-চালিত পরিধানযোগ্য যন্ত্র ব্যক্তিগত সহকারীর মতো কাজ করতে পারে। তবে মাইক্রোফোন, ক্যামেরা ও ব্যক্তিগত তথ্যের নাগাল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞেরা।

স্মার্ট গ্লাসে ক্যামেরা, স্মার্টওয়াচে স্বাস্থ্য-পর্যবেক্ষণ, আর কণ্ঠনির্ভর এআই সহকারী – শরীরের সঙ্গে থাকা প্রযুক্তি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই যন্ত্রগুলি শুধু পদক্ষেপ গোনা বা বার্তা দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নির্দিষ্ট ডিভাইস ও পরিষেবার ক্ষেত্রে ফোন হাতে না নিয়েও নানা কাজ করাতে পারে। কিন্তু সুবিধার সঙ্গে জুড়ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: দৈনন্দিন জীবনে এআইকে যত বেশি তথ্য ও প্রবেশাধিকার দেওয়া হচ্ছে, ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা ততটা সুরক্ষিত থাকছে কি?
‘গ্লোবালডেটা’র টেলিকম বিভাগের সিনিয়র অ্যানালিস্ট আমান্ডা মিচেলের বক্তব্য, এআই পরিধানযোগ্য ডিভাইসকে নিছক ট্র্যাকিংয়ের যন্ত্র থেকে ব্যক্তিগত সহকারীর ভূমিকায় নিয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, ডিভাইস বা এআই এজেন্টের ধরন অনুযায়ী, ফোন না ধরেই ফ্লাইট বুক করা, মুদির কেনাকাটা করা কিংবা কথোপকথনের আগের অংশ আবার শোনার মতো কাজ সম্ভব হতে পারে। স্মার্ট গ্লাস, পোশাকে লাগানো ক্লিপ-অন ডিভাইস এবং স্মার্টওয়াচ – নানা ধরনের যন্ত্র এই পরিবর্তনের অংশ।
সুবিধার সঙ্গে বাড়ছে তথ্যের নাগাল
এ ধরনের কাজের জন্য কোনও ডিভাইসকে ব্যবহারকারীর কণ্ঠ, পছন্দ, অবস্থান বা বিভিন্ন ডিজিটাল পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত তথ্য বুঝতে হতে পারে। তবে সব পরিধানযোগ্য যন্ত্র একইভাবে কাজ করে না, এবং কোন তথ্য সংগ্রহ বা ব্যবহার করা হয় তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট পণ্য, সেটিংস ও পরিষেবার শর্তের উপর। তাই “এআই ডিভাইস” বললেই এক ধরনের তথ্যপ্রবাহ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
মিচেল যে ঝুঁকির কথা তুলেছেন, তার মধ্যে রয়েছে ব্যবহারকারীর অজান্তে স্মার্ট গ্লাসে রেকর্ডিং হওয়ার সম্ভাবনা। আশপাশের মানুষও বুঝতে নাও পারেন যে তাঁদের ছবি বা কথোপকথন ধারণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, কিছু যন্ত্র বা সংশ্লিষ্ট এআই পরিষেবার ক্ষেত্রে মাইক্রোফোন, স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য, ইমেল, ক্যালেন্ডার কিংবা কথোপকথনের মতো সংবেদনশীল তথ্যের সঙ্গে সংযোগ থাকতে পারে। কোন তথ্য কতটা সময় রাখা হয়, কারা তা দেখতে পারে এবং অন্য কাজে ব্যবহার হয় কি না – এসবই ব্যবহারকারীর যাচাই করা দরকার।
গোপনীয়তার প্রশ্নটি তাই শুধু ডিভাইস চালু বা বন্ধ রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যন্ত্রটি কখন শুনছে বা রেকর্ড করছে, তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে, তা মুছে ফেলার সুযোগ আছে কি না এবং কোন অ্যাপ বা অ্যাকাউন্টের অনুমতি দেওয়া হয়েছে— এগুলিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও একটি নিরাপত্তা-সূচক আলো বা আইকন থাকলেই সব পরিস্থিতিতে রেকর্ডিং সম্পর্কে আশপাশের মানুষ নিশ্চিতভাবে জানতে পারবেন, এমন ধরে নেওয়া উচিত নয়।
নির্মাতার দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন
মিচেলের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবহারকারীদের চাপের মুখে মেটা তাদের স্মার্ট গ্লাসের রেকর্ডিং-সংক্রান্ত আলোর ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে। তবে তাঁর বৃহত্তর উদ্বেগ, নতুন ডিভাইস বাজারে আনার তৎপরতার তুলনায় অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিগত অনুপ্রবেশ ঠেকানোর ব্যবস্থা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে কি না। এই মন্তব্যকে নির্দিষ্ট পণ্যের সব নীতি বা কার্যকারিতার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ হিসেবে দেখা যাবে না; বরং দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তিতে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে একটি উদ্বেগ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
ইউরোপীয় ডেটা প্রোটেকশন বোর্ডের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে মিচেল বলেন, গোপনীয়তা রক্ষার সমস্ত দায় ব্যবহারকারীর উপর চাপিয়ে দিয়ে নির্মাতারা নিজেদের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। অর্থাৎ স্পষ্ট তথ্য দেওয়া, উপযুক্ত গোপনীয়তা-সুরক্ষা নকশায় রাখা এবং ব্যবহারকারীকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার মতো বিষয়েও নির্মাতার ভূমিকা রয়েছে। তবে কোন নিয়ম কোনও নির্দিষ্ট ডিভাইস বা দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা সংশ্লিষ্ট আইন ও পণ্যের ব্যবহার-পদ্ধতির উপর নির্ভর করে।
ব্যবহারকারীরা কী কী দেখে নিতে পারেন?
নতুন কোনও এআই-চালিত পরিধানযোগ্য ডিভাইস ব্যবহারের আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করলে ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়:
- অনুমতি: ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, স্বাস্থ্যতথ্য, যোগাযোগের তালিকা বা ক্যালেন্ডারে প্রবেশের অনুমতি কেন চাইছে, তা দেখুন। প্রয়োজনের বাইরে অনুমতি দেবেন না।
- রেকর্ডিং নিয়ন্ত্রণ: কখন রেকর্ডিং শুরু হয়, কীভাবে তা বন্ধ করা যায় এবং রেকর্ডিংয়ের ইঙ্গিত কী— পণ্যের নির্দেশিকা থেকে জেনে নিন।
- তথ্য সংরক্ষণ ও মুছে ফেলা: তথ্য কত দিন রাখা হয়, তা মুছতে বা ডাউনলোড করতে কী করতে হয় এবং সেটিংস কোথায়— যাচাই করুন।
- সংযুক্ত অ্যাকাউন্ট: ইমেল, ক্যালেন্ডার বা অন্য অ্যাকাউন্ট যুক্ত করার আগে সেই সংযোগের প্রয়োজন ও সুবিধা বিবেচনা করুন।
- অন্যের গোপনীয়তা: ব্যক্তিগত আলাপ, কর্মক্ষেত্র বা এমন জায়গায় যন্ত্র ব্যবহার করার সময় আশপাশের মানুষের সম্মতি ও প্রযোজ্য নিয়মের কথা মাথায় রাখুন।
এই পদক্ষেপগুলি সব ঝুঁকি দূর করে না, তবে কোন তথ্যের উপর ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ আছে তা বুঝতে সাহায্য করতে পারে। প্রস্তুতকারকের নীতিমালা ও সেটিংস সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, তাই একবার দেখে থেমে না থেকে প্রয়োজনমতো আবার যাচাই করা দরকার।
সুবিধার বিনিময়ে কতটা প্রবেশাধিকার?
এআই সহকারীর তাৎক্ষণিক সাহায্য আকর্ষণীয়— বিশেষ করে যখন হাত ব্যস্ত, ফোন দূরে, কিংবা দ্রুত তথ্য প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিটি সুবিধার জন্য কতটা ব্যক্তিগত তথ্য ভাগ করতে হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনও ডিভাইস ব্যবহার করা বা না করার সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত; তার আগে তথ্য সংগ্রহের ধরন, নিয়ন্ত্রণের সুযোগ এবং সম্ভাব্য প্রভাব বোঝা দরকার। প্রযুক্তি যত ব্যক্তিগত পরিসরের কাছাকাছি আসছে, নির্মাতার স্বচ্ছতা ও ব্যবহারকারীর সচেতন পছন্দ— দুটিই তত বেশি জরুরি হয়ে উঠছে।



