আসন্ন ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্য রাজনীতিতে বড়সড় চমক দিল ভারতীয় জনতা পার্টি। কলকাতার নিউটাউনের একটি হোটেল থেকে দলের নির্বাচনী ইস্তেহার প্রকাশ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এই ইস্তেহারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভয় নয় ভরসা’। শুরু থেকেই স্পষ্ট করে দেওয়া হয়—রাজ্যের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর পাল্টা হিসেবে আরও বড় আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি দিতে চলেছে বিজেপি।
মহিলাদের জন্য ৩,০০০ টাকা—সবচেয়ে বড় ঘোষণা
ইস্তেহারের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হল মহিলাদের জন্য মাসিক ভাতা। বিজেপি জানিয়েছে, ক্ষমতায় এলে রাজ্যের মহিলাদের প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হবে। এই প্রকল্পকে অনেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর সরাসরি পাল্টা হিসেবে দেখছেন।
বিজেপির দাবি, এই ভাতার মাধ্যমে মহিলাদের আর্থিক স্বাধীনতা বাড়বে এবং পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
যুবকদের জন্য বেকার ভাতা ও শিক্ষায় সহায়তা
শুধু মহিলারাই নন, যুব সমাজকেও লক্ষ্য করে একাধিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বেকার যুবক-যুবতীদের প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এর পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এককালীন ১৫,০০০ টাকা দেওয়ার ঘোষণাও করা হয়েছে। এতে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পড়ুয়াদের উপকার হবে বলে দাবি বিজেপির।
আইন-শৃঙ্খলা ও অনুপ্রবেশে কড়া অবস্থান
ইস্তেহারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আইন-শৃঙ্খলা এবং অনুপ্রবেশ রোধ। বিজেপি জানিয়েছে, ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের কাজ সম্পূর্ণ করা হবে।
‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’ নীতি গ্রহণ করে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে দ্রুত অ্যাকশন নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট রোডম্যাপ আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় প্রতিশ্রুতি
সরকারি কর্মচারীদের জন্যও একাধিক ঘোষণা রয়েছে। বিজেপি জানিয়েছে, সরকার গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন চালু করা হবে এবং বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (DA) প্রদান করা হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে প্রতি বছর নিয়ম করে SSC পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিয়োগ দুর্নীতির কারণে যারা চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের জন্য বয়সে ৫ বছরের ছাড় দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে বিশেষ জোর
উত্তরবঙ্গের জন্য আলাদা করে একগুচ্ছ উন্নয়ন প্রকল্প ঘোষণা করেছে বিজেপি। সেখানে AIIMS, IIT এবং IIM স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গে দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। চা ও পাট শিল্পের উন্নয়নেও বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কলকাতা ও পরিকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা
কলকাতার জন্য ১০ বছরের একটি বিশেষ অ্যাকশন প্ল্যান ঘোষণা করা হয়েছে। হলদিয়া বন্দরের আধুনিকীকরণ এবং তাজপুর ও কুলপিতে ডিপ সি পোর্ট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া চারটি নতুন স্যাটেলাইট টাউনশিপ তৈরি করে শহরের চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে ‘বন্দেমাতরম মিউজিয়াম’ তৈরির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্তেহার স্পষ্টভাবে ভোটব্যাঙ্ককে লক্ষ্য করে তৈরি। মহিলাদের জন্য বড় অঙ্কের ভাতা এবং যুবকদের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর পাল্টা হিসেবে এই ঘোষণা কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সব মিলিয়ে, বিজেপির এই ‘ভয় নয় ভরসা’ ইস্তেহার রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। আর্থিক সহায়তা, কর্মসংস্থান, আইন-শৃঙ্খলা—সব দিকেই জোর দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত এই প্রতিশ্রুতিগুলি ভোটারদের কতটা প্রভাবিত করবে, তার উত্তর মিলবে নির্বাচনের ফলাফলে।










