News

সরকার বদলালে পুলিশ আধিকারিকদের রেয়াত নয়, হুঁশিয়ারি অভিষেকের

কাজল শেখের বাড়িতে পুলিশ যাওয়া ও তাঁর নিরাপত্তা তুলে নেওয়ার অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুলিশি পদক্ষেপের দাবি করেছেন তৃণমূল সাংসদ; পাল্টা কটাক্ষ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর।

পুলিশ আধিকারিকদের উদ্দেশে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা স্পষ্ট এবং কঠোর: রাজনৈতিক নির্দেশে কাজ করে তৃণমূল কর্মীদের মিথ্যা মামলায় জড়ালে, সরকার বদলের পর তাঁদেরও জবাবদিহি করতে হবে। কাজল শেখের নিরাপত্তা তুলে নেওয়া এবং তাঁর বীরভূমের বাড়িতে পুলিশের যাওয়ার অভিযোগকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার এই হুঁশিয়ারি দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তাঁর বক্তব্য, কোনও পুলিশকর্মীই আইনের ঊর্ধ্বে নন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, যাঁরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজ করছেন বলে তাঁর অভিযোগ, তাঁদের নাম চিহ্নিত করে রাখা হচ্ছে।

কাজল শেখকে ঘিরে কী অভিযোগ

হাসনের বিধায়ক কাজল শেখের নিরাপত্তারক্ষীদের রাজ্য সরকার সরিয়ে নিয়েছে—বৃহস্পতিবার এমন অভিযোগ করেন তিনি। ওই দিন সন্ধ্যায় তাঁর বীরভূমের বাড়িতে পুলিশ পৌঁছয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুই ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকার জন্য এবং কাজল শেখ সমর্থন জানিয়েছেন বলে তাঁর বাড়িতে তাণ্ডব চালানো হচ্ছে। নিরাপত্তারক্ষী প্রত্যাহার এবং পুলিশের উপস্থিতিকে তিনি রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখেছেন।

তবে এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে নেই। নিরাপত্তা প্রত্যাহারের কারণ কী, পুলিশের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, কিংবা ওই পদক্ষেপের সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থানের কোনও যোগ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সরকারি ব্যাখ্যা বা পুলিশের বক্তব্যও সেখানে দেওয়া হয়নি। ফলে অভিষেকের বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা জরুরি; ঘটনাগুলির পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।

পুলিশকে কী বললেন তৃণমূল সাংসদ

অভিষেকের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতাদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে পুলিশের একাংশ তৃণমূল কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসাচ্ছে। যাঁরা শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে কাজ করছেন বলে তিনি মনে করেন, তাঁদের সতর্ক করে বলেন, সরকার বদলালে তাঁদের কেউ রক্ষা করতে পারবেন না। তাঁর বক্তব্যে শুধু ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক পরিণতির ইঙ্গিতই ছিল না; আইন মেনে কাজ করার কথাও ছিল। তিনি বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন এবং কারও কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইলেই দায় এড়ানো যাবে না।

এই মন্তব্যে রাজনৈতিক ভাষার পাশাপাশি প্রতিশোধের সুরও রয়েছে। প্রশাসনিক আধিকারিকদের উদ্দেশে ভবিষ্যতে কাউকে রেয়াত না করার হুঁশিয়ারি গণতান্ত্রিক বিতর্কে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে: রাজনৈতিক পালাবদলের পর সরকারি কর্মীদের ভূমিকা কীভাবে বিচার হবে? কোনও আধিকারিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে—রাজনৈতিক পরিচয় বা বদলা নেওয়ার ঘোষণায় নয়।

সুমিত রায়ের গ্রেফতারি প্রসঙ্গ

অভিষেক তাঁর আপ্তসহায়ক সুমিত রায়ের গ্রেফতারির কথাও তোলেন। তাঁর দাবি, তাঁকে লক্ষ্য করে তিরিশটি মামলা হয়েছে এবং আপ্তসহায়ককে মিথ্যা মামলায় দুই থেকে তিন মাস আটকে রাখা হয়েছে। কয়েক জন পুলিশ আধিকারিককে পুরস্কারের আশ্বাস দিয়ে এই পদক্ষেপ করানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে মামলাগুলির বিবরণ, গ্রেফতারির আইনি ভিত্তি কিংবা তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য নেই। তাই এই বক্তব্যও অভিষেকের অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখযোগ্য, প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।

তিনি আরও বলেন, তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে বলে যাঁদের চিহ্নিত করা হচ্ছে, তাঁদের নাম নথিভুক্ত রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কোন আধিকারিকের কী পরিণতি হয়, তা দেখার কথা বলেও তিনি সতর্ক করেন। এই ভাষা রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে শক্ত বার্তা হতে পারে, কিন্তু প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগও তৈরি করে। অভিযোগ সত্য হলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত।

শুভেন্দু অধিকারীর পাল্টা কটাক্ষ

অভিষেকের বক্তব্যের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁকে কটাক্ষ করেন। প্রতিবেদনে তাঁর মন্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, অভিষেককে ডায়মন্ড হারবারে গিয়ে বিজয়া পালন করতে বলা হোক। এর আগে ডায়মন্ড হারবারে অভিষেকের উপস্থিতি নিয়েও তাঁকে খোঁচা দিয়েছিলেন শুভেন্দু। রাজনৈতিক সংঘাতের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে দু’পক্ষের অবস্থান স্পষ্ট হলেও, কাজল শেখের নিরাপত্তা প্রত্যাহার বা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলির উত্তর মেলে না।

অভিযোগের নিষ্পত্তি চাই প্রমাণ ও প্রক্রিয়ায়

এই ঘটনায় মূলত তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার: কাজল শেখের নিরাপত্তা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত, তাঁর বাড়িতে পুলিশের যাওয়ার কারণ, এবং তৃণমূল কর্মী ও সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে মামলাগুলির আইনি ভিত্তি। এগুলির কোনওটিরই মীমাংসা কেবল রাজনৈতিক মঞ্চের বক্তব্যে হবে না। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও পুলিশকে পদক্ষেপের কারণ জানাতে হবে; অন্যদিকে, রাজনৈতিক অভিযোগেরও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন।

পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। একইভাবে, নির্বাচনী পালাবদলের পরে আধিকারিকদের শাস্তির হুঁশিয়ারিও সেই আস্থাকে দুর্বল করতে পারে। তাই অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, জবাবদিহির পথ হওয়া উচিত স্বচ্ছ তদন্ত ও আদালত-সহ আইনসম্মত প্রক্রিয়া। আপাতত অভিষেকের অভিযোগ এবং শুভেন্দুর পাল্টা কটাক্ষের বাইরে, ঘটনাগুলির পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই।

Related Articles

Back to top button