রায়গঞ্জে এইমসের প্রস্তাব, জলপাইগুড়িতে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতাল: উত্তরবঙ্গের জন্য বড় ঘোষণা
দিকনগরে এইমসের প্রস্তাব কেন্দ্রের কাছে পাঠানোর কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রশাসনিক বৈঠকে হাসপাতাল, ট্রমা পরিষেবা ও স্মার্ট স্কুল নিয়েও একাধিক পরিকল্পনা সামনে এসেছে।

রায়গঞ্জে এইমস গড়ার ঘোষণা হলেও এখনই নির্মাণ শুরু হচ্ছে না—প্রথম ধাপে কেন্দ্রের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর কথা জানিয়েছে রাজ্য সরকার। উত্তর দিনাজপুরের দিকনগরে এইমসের প্রস্তাব এবং জলপাইগুড়িতে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবা ঢেলে সাজানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই দুই ঘোষণার পাশাপাশি জেলা হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন, ট্রমা অ্যাম্বুল্যান্স ও প্যাথলজি পরিষেবার কথাও উঠে এসেছে।
দিকনগরে এইমসের প্রস্তাব, তবে কেন্দ্রের অনুমোদন বাকি
বৃহস্পতিবার রায়গঞ্জে প্রশাসনিক বৈঠক এবং পরে কর্ণজোড়ার তিস্তা ময়দানে জনপরিষেবা প্রদান কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেন, রাজ্য সরকার রায়গঞ্জের দিকনগরে এইমস তৈরির প্রস্তাব কেন্দ্রের কাছে পাঠাবে। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে সেটি হবে রাজ্যের দ্বিতীয় এইমস—এমনটাই জানিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে কেন্দ্রীয় অনুমোদনের বিষয়টি স্পষ্ট। ফলে ঘোষণাটিকে নির্মাণকাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এইমসের মতো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রস্তাব পাঠানো, তা বিবেচনা ও অনুমোদন, এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন—প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। সভায় প্রস্তাব পাঠানোর কথা বলা হলেও অনুমোদনের সময়সীমা, প্রকল্পের অর্থায়ন বা নির্মাণ শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি।
অধিকারী বলেন, কাজ এগোলে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দিকনগরে ভূমিপুজোর অনুষ্ঠানে আসবেন। এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ইঙ্গিত; তবে তার আগে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত এবং প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ধাপগুলি সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। উত্তর দিনাজপুরে উন্নত চিকিৎসার পরিকাঠামো গড়ে উঠলে জেলার বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষেরও সুবিধা হতে পারে। সেই সম্ভাবনা বাস্তব হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রস্তাবের অগ্রগতি ও পরিষেবা চালুর প্রস্তুতির উপর।
জলপাইগুড়িতে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতালের পরিকল্পনা
জলপাইগুড়ির জন্য পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতাল তৈরির কথাও ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, জলপাইগুড়িকে নিরাশ করা হবে না এবং সেখানে স্বাস্থ্য পরিষেবা ঢেলে সাজানো হবে। তবে হাসপাতালটির অবস্থান, শয্যাসংখ্যা, চিকিৎসার বিশেষ বিভাগ, অর্থ বরাদ্দ বা নির্মাণের সময়সূচি সম্পর্কে এই ঘোষণায় বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
ক্যানসার চিকিৎসায় রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। তাই ‘পূর্ণাঙ্গ’ হাসপাতালের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তার কার্যকারিতা নির্ভর করবে শুধু ভবন তৈরির উপর নয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-পরিকাঠামো ও পরিষেবা কতটা গড়ে ওঠে তার উপরও। এখন পর্যন্ত ঘোষণাটি একটি পরিকল্পনা; পরবর্তী সরকারি বিবরণেই প্রকল্পের পরিধি ও বাস্তবায়নের রূপরেখা স্পষ্ট হওয়ার কথা।
জেলায় হাসপাতাল ও জরুরি পরিষেবা উন্নয়নের ঘোষণা
প্রশাসনিক বৈঠকে ৩০টি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে এবং ৮৩টি কর্মসূচির শিলান্যাস করা হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান। উত্তর দিনাজপুরের হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো উন্নত করা এবং স্মার্ট স্কুল তৈরির পরিকল্পনাও বৈঠকে আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেন, হাসপাতালগুলির চেহারা বদলে দেওয়া হবে।
জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ১০টি ট্রমা অ্যাম্বুল্যান্স, প্যাথলজি সেন্টার এবং প্রধানমন্ত্রী জন ঔষধি ও অমৃত যোজনার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘোষণায় এই পরিষেবাগুলির কথা থাকলেও সেগুলি কোন কোন জায়গায় চালু হয়েছে বা হবে, কত দ্রুত কাজ এগোবে, কিংবা হাসপাতালগুলির জন্য কী পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে—তা বিস্তারিতভাবে বলা হয়নি। পরিকল্পনার বাস্তব ফল বোঝার জন্য পরিষেবা চালুর অগ্রগতি, প্রয়োজনীয় কর্মী এবং সাধারণ মানুষের কাছে তার পৌঁছনো খতিয়ে দেখা জরুরি।
সীমান্ত ও জমি নিয়েও বক্তব্য
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী উত্তর দিনাজপুরে অনুপ্রবেশ এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জন্য জমির প্রসঙ্গও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ৭.৯১৬১ একর জমি বিএসএফকে দেওয়া হয়েছে। শরণার্থীদের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় আনার কথা বলেন তিনি; একই সঙ্গে যাঁদের অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করা হবে, তাঁদের বিষয়ে পুলিশ ও বিএসএফকে খবর দেওয়ার আহ্বান জানান। এগুলি মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বক্তব্য—ঘোষণার বাইরে এ বিষয়ে অতিরিক্ত কোনও সরকারি বিবরণ দেওয়া হয়নি।
রায়গঞ্জের এইমসের প্রস্তাব এবং জলপাইগুড়ির ক্যানসার হাসপাতালের পরিকল্পনা উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কিন্তু ঘোষণা আর চালু হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অনুমোদন, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিষেবা প্রস্তুতির একাধিক ধাপ। এখন নজর থাকবে কেন্দ্রের কাছে প্রস্তাব পাঠানো, প্রকল্পের বিশদ প্রকাশ এবং জেলা হাসপাতালগুলির ঘোষিত উন্নয়ন কতটা বাস্তবে এগোয় তার দিকে।



